৪/৪/২০১৭
ট্রেন টা ছেড়ে দিল বেশ জোরে শব্দ করে। হাওড়া থেকে সিউড়ি যেতে যেতে কি করব ভাবছিলাম, তাই বুদ্ধি করে খাতা আর পেন টা ব্যাগে আনতে ভুলিনি। ট্রেনের জানলায় বসলেই আমার কেমন নিজেকে নিজেকে কবি কবি বলে মনে হয়। কিন্তু লিখতে গিয়ে কবিতা তার কবিত্ব হারিয়ে গদ্য হয়ে যায় তাই এবার প্রথম থেকেই সহজ ভাষায় গদ্য লিখব। টিকিট কাটার সময় টিকিট কাউন্টার এর লোকটাকে বলেছিলাম জানলার ধারে যেন সিট হয়। তবে এবারে ভাগ্য ভালো, এই জানলা দিয়ে অতীত নয়, ভবিষ্যৎ দেখা যায়, মানে হলো গিয়ে ট্রেনটার গতির অভিমুখের জানলা। এবাবা, এতসব লিখতে গিয়ে ভুলেই গেছিলাম আমি কে, কি করি, কোথায় যাচ্ছি ইত্যাদি ইত্যাদি। নমস্কার, আমি অভিজিৎ মুখার্জী। পেশা বলতে ছাত্র আর ওই আর্ট কলেজে একটু আকিবুকি করি। বাড়ি সিউড়ি, কলকাতা থাকি কলেজের জন্য। পরীক্ষার শেষে বাড়ি ফিরছি। বাড়ি ফেরার আনন্দ আমার একটু বেশি, কারন ওই মেসে থেকে দোকানের খাবার খেয়ে পেটটা মাঝে মাঝেই বিগড়ে যায়। আমার বান্ধবী অদৃতা রায়, সে আবার ওই ট্রিপিকাল বাঙালি, কলকাতা ছাড়া কিছুই ওর ভালোলাগেনা। একদিকে উত্তর কলকাতার বনেদিয়ানা আর আভিজাত্য নিয়ে জ্ঞান মারবে আবার আমার সাথে বসে শ্যাম্পেন ও খাবে। আমার বাড়িতে অনেক সদস্য, তবে একান্নবর্তী পরিবার তাই গেলে মজা হয়। আমাদের সম্পর্কটাও সবাই মেনে নিয়েছিল, বেশ হেসে খেলে দিন কেটে যেত।।আমার বোন রিয়া অদৃতার বন্ধু। সেই সূত্রেই আমাদের আলাপ। রিয়ার একটা স্পেশাল বন্ধু আছে, নাম অগ্নি, ডাক্তারি নিয়ে মেডিকেল কলেজে পড়ছে। ওদের প্রেম টা হয়েও হয়ে ওঠেনা। দুজনে ঘুরতে যায় গল্প করে, অবসর সময়ের পুরোটাই একসাথে থাকে প্রায় তারপরেও প্রেম টা আসেনি ওদের মধ্যে। রিয়া অবশ্য আমার নিজের বোন নয়, মামাতো বোন, মামা মামী একটা দুর্ঘটনায় মারা যায় তারপর থেকে আমাদের কাছেই রিয়া বড় হয়েছে। রিয়া ভালো গান করে। ও আর অদৃতা বন্ধু কম, দিদি বোন বেশি। রিয়া ও কলকাতায় থেকেই কলেজ টা করছে। আমাদের পরিবারে সংস্কৃতির চর্চা খুব বেশি, আমিও দু তিনটে যাত্রা নাটক করেছি। কিন্তু মন বসেনি। অদৃতার বাবা নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখে, অদৃতার ঐদিকে ঝোঁক নেই, ওর ঝোঁক অন্য বিষয়ে। ক্যামেরা নিয়ে কলকাতার গলি গলি ঘুরে যত্রতত্র ছবি তোলে। আমিও সাথে থাকি কিন্তু মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে। ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলা অবসেশন বা পাগলামিটা ওর কাটেইনা। আর যদি রিয়া থাকে তাহলে তো ভূত খুঁজতে চলে যায় ক্যামেরা নিয়ে। ওদের কাছে হত টপিক ভূত প্রেত নামক যতসব বুজরুকি। অদৃতার সাথে ২বছরের বেশি সম্পর্ক, বোঝাবুঝিটাও বেশ ভালো। ঘটনা চক্রে একদিন আমি ওদের মাঝে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম, ব্যাস অমনি আমায় নিয়ে বাগবাজার থেকে পুতুলবাড়ি খুঁজতে খুঁজতে সারাটা বিকেল নষ্ট করল। রিয়ার আগেই পরীক্ষা শেষ হয়েছে ও ফিরেও গেছে। খাতা থেকে চোখ তুলতে দেখি ব্যান্ডেল স্টেশন। একটা ঝালমুড়ি নিয়ে ট্রেনে উঠতেই দেখি আমার উল্টোদিকে অদৃতা। যদিও পুরো উল্টোদিকে নয়, তবু একই কামরা। আমার দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসি, আর আমি ওর দিকে তাকিয়ে থ হয়ে গেলাম। আপনি ভাবুন ও ব্যান্ডেল এল কিভাবে, আমি কিছু জানিনা আবার ট্রেনে উঠল কিভাবে টিকিট কেটেছে নাকি কিন্তু তাহলেও তো রিজার্ভেশন করা দরকার। মাথার মধ্যে হাজার প্রশ্ন আসছে সাথে ও এগিয়ে এসে এক চোখ মেরে দেয়। ট্রেনটা ছাড়তেই জানলার দিকে তাকিয়ে ও কাউকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায় আমিও যথারীতি অবাক হয়ে জানলা দেখতেই বুঝি ওর বাবা। ওর সিটটা অন্য ব্লকে পড়ায় সিট এডজাস্ট করতে আরো ৫মিনিট চলে গেলো। এবার ও আমার পাশে বসে আমায় যা বলল তা সংক্ষেপে এই যে, যেদিন আমি টিকিট কেটেছিলাম ও সেদিন আমার সাথেই কেটেছিল তবে ফোন থেকে। ও চেয়েছিল আমার বাড়ি যেতে। তবে ও টিকিট কেটেছে ব্যান্ডেল থেকে। তারপর এখন শিয়ালদহ থেকে ব্যান্ডেল এসে আমায় অবাক করে খুব মজা পেয়েছে। সত্যি বলতে কি আমিও খুব খুশি হয়েছি, আমারও ইচ্ছে ছিল আমাদের বাড়িতে ওকে নিয়ে যাওয়ার। যায় হোক এবার আর লিখতে পারবোনা। উনি এখন গজগজ করতে শুরু করে দিয়েছেন।
Comments
Post a Comment